অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণ-Causes of irregular periods

অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণ-Causes of irregular periods

পিরিয়ড নারীদেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত ২৮ দিন পর পর পিরিয়ড হয়ে থাকে। কিন্তু কখনও কখনও এই সময়টাতে হেরফের হতে পারে। কখনও এক সপ্তাহ পরে হতে পারে পিরিয়ড। আবার মাঝে মাঝে একমাস কিংবা আরো বেশি সময় পরও হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে যদি পিরিয়ড না হয় তাহলে অনেক নারীই দুশ্চিন্তায় থাকেন। বিশেষ করে বিবাহিত নারীরা ঘাবড়ে যান অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করে ফেলেছেন ভেবে। গর্ভধারণ ছাড়াও অন্য আরো কিছু কারণে পিরিয়ডে বিলম্ব হতে পারে।

মাসিক বা পিরিয়ড নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ জিনিস নয় এবং কেউই এটির জন্য উন্মুখ হয় না । তবে, এগুলি আপনার সামগ্রিক প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ । আপনার মাসিক চক্রটি নিয়মিত থাকলে এবং আপনি আপনার তারিখগুলি জানলে এটি আপনার পক্ষে সহায়ক হবে, যাতে আপনি আপনার ডেটস এবং বিশেষ উপলক্ষগুলির পরিকল্পনা করতে পারেন । দুর্ভাগ্যবশত, অনিয়মিত পিরিয়ডের বা মাসিক চক্রের সাথে মোকাবিলা করতে থাকা সকল নারীর পক্ষে এটি সত্য নাও হতে পারে । অনিয়মিত পিরিয়ড এবং কিভাবে এটির সাথে মোকাবেলা করতে হবে তা সম্পর্কে চলুন আরও জানি ।

অনিয়মিত পিরিয়ড কি?

অনিয়মিত পিরিয়ড সাধারণত হরমোনের ভারসাম্যহীনতার একটি লক্ষণ । একটি নিখুঁত মাসিক চক্র ২৮ দিন দীর্ঘ হয় । সুতরাং, যদি কেউ ২৯তম দিন তাদের পিরিয়ড পায়, তবে এটি একটি স্বাস্থ্যকর মাসিক চক্র থাকার লক্ষণ । কিন্তু যদি আপনি ২১ দিন বা তার আগে আপনার পিরিয়ড পান এবং আপনার পিরিয়ডের মেয়াদ ৮ দিনেরও বেশি সময় ধরে থাকে তবে আপনার অনিয়মিত মাসিক চক্র রয়েছে । এছাড়াও, যদি আপনি দেরীতে পিরিয়ড পান বা মিস করেন, তবেও আপনার একটি অনিয়মিত মাসিক চক্র আছে ।

অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণ কি?
মহিলাদের অনিয়মিত পিরিয়ডের উপর অবদান রাখে এমন অনেক কারণ আছে । এই কারণগুলি প্রায়ই একটি অস্বাস্থ্যকর জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত হয় ।

১) চাপের উচ্চ স্তর
পিরিয়ডের সময় চাপ ডিম্বস্ফোটনকে প্রতিরোধ করতে পারে । ইস্ট্রোজেন এবং অন্যান্য প্রজনন হরমোন উৎপাদন উচ্চ চাপের কারণে বাধাগ্রস্ত হয় । ফলস্বরূপ, আপনার গর্ভাশয়ের আস্তরণটি যে ভাবে তৈরি করা উচিত তা তৈরি করে না এবং আপনি সময়মত আপনার পিরিয়ড পাবেন না ।

২) অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমূহ কম রয়েছে এমন খাবারগুলি একটি মহিলার শরীরের বিভিন্ন হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে উত্তেজিত করতে পারে । এটি, পরিবর্তে, একটি অনিয়মিত মাসিক চক্রের জন্য দায়ী হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, অতিরিক্ত মিশ্রিত পদার্থ এবং কীটনাশকের মতো উদ্দীপকপূর্ণ খাবারগুলি অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিগুলির স্বাভাবিক কাজকে উত্তেজিত করতে পারে এবং এর ফলে কর্টিসোল বৃদ্ধি পেতে পারে । উচ্চ কর্টিসোল প্রজনন হরমোন সহ অনেক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধা দেয় ।

৩) একটি চাপযুক্ত ওয়ার্ক-আউট শাসন

এটি দেখা গেছে যে অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণে চাপ বা পরিশ্রমের ফলে অ্যাড্রেনাল, থাইরয়েড এবং পিটুইটারি গ্রন্থিগুলির স্বাভাবিক কার্যকারিতা হ্রাস পায় যার ফলে পিরিয়ডগুলি অনিয়মিত হয়ে যায় ।

৪) থাইরয়েড
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে থাইরয়েড সমস্যাগুলি থেকে ভুগতে থাকা মহিলারা প্রায়ই তাদের পিরিয়ড অনিয়মিত হয় বা মিস করেন ।

৫) জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল
জন্ম নিয়ন্ত্রক পিলগুলির পিরিয়ডের উপর সরাসরি প্রভাব আছে । এটি মাসিক চক্রকে হালকা করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিরিয়ড সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় ।

৬) পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম
এটি একটি চিকিৎসামূলক অবস্থা যাতে ডিম্বাশয়তে খুব ছোট্ট ছোট্ট সিস্ট উপস্থিত হয় । এই অবস্থাইয় ভোগা মহিলারা অনিয়মিত মাসিক চক্রের অভিজ্ঞতা ভোগ করে ।

৭) চরম ওজন কমানো
আপনার শরীরের BMI ১৮ বা ১৯-এর নিচে নেমে গেলে, আপনি কম শরীরের চর্বির কারণে অনিয়মিত পিরিয়ড অনুভব করতে পারেন । দেহের চর্বি ইস্ট্রোজেন তৈরি করতে সহায়তা করে, যা ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যকারিতাগুলির জন্য অপরিহার্য ।

৮) হঠাৎ বেশি ওজন লাভ
একটি স্বল্প সময়ের মধ্যে ওজনের একটি নাটকীয় বৃদ্ধি শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কাজকর্মকে প্রভাবিত করতে পারে । এর মধ্যে যৌন হরমোনও অন্তর্ভুক্ত । এটি অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণ হতে পারে ।

৯) খাবারে অ্যালার্জি
কিছু খাবারের অ্যালার্জি, যেমন অনিয়মিত গ্লুটেন বা সেলিয়াক রোগ, শরীরের হরমোনকে প্রভাবিত করতে পারে । এটি যৌন হরমোনগুলির স্বাভাবিক কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করে যা অনিয়মিত মাসিক চক্র সৃষ্টি করতে পারে ।

১০) অন্যান্য চিকিৎসাগত শর্তাবলী
ডায়াবেটিস, ফাইব্রোইয়েড, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং যৌন সংক্রামিত রোগের মতো চিকিৎসাগত পরিস্থিতির শিকার হওয়া একজন মহিলা অনিয়মিত পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে ।

১১) বয়স
এটি দেখা গেছে যে যখন একটি মেয়ে প্রথমবার তার পিরিয়ড পায়, স্বাভাবিক হতে কিছু সময় লাগে । এটি শুধুমাত্র বয়সের সঙ্গে মহিলাদের মাসিক চক্র নিয়মিত হয়ে যায় । একটি কিশোর বয়সের সময় এটি একটি সাধারণ ঘটনা তাই অনিয়মিত পিরিয়ডের জন্য চিন্তিত হতে হবে না ।

জেনে নিন কারণগুলো:

হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত ব্যায়াম- খুব কঠিন ডায়েট করলে কিংবা কোনও কারণে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক ওজন কমে গেলে পিরিয়ডে বিলম্ব হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণেও পিরিয়ড বিলম্বিত হতে পারে। বিএমআই যদি ১৮/১৯ এর নিচে হঠাৎ করে নেমে যায় তাহলে পিরিয়ড বিলম্বে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা- আমাদের গলার নিচে যেই থাইরয়েড গ্রন্থি থাকে সেটা শরীরের সকল কার্যপ্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে যদি স্বাভাবিকের চাইতে বেশি কিংবা কম থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত হয় তাহলে শরীরের পুরো কার্যপ্রক্রিয়ায় তার প্রভাব পড়ে এবং এক্ষেত্রে পিরিয়ডে বিলম্ব হতে পারে।

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম- পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম একটি হরমোনাল সমস্যা। শরীরের জরুরি তিনটি হরমোন এস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন এবং টেসটোস্টেরন উৎপাদনের মাত্রা কমে যায় পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম হলে। ফলে পিরিয়ডে বিলম্ব হয়। পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোমে নারীদের মুখে এবং স্তনের চারিদিকে লোমের আধিক্য বেড়ে যেতে পারে। এই সমস্যায় যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ হঠাৎ অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হলে পিরিয়ডে বিলম্ব হতে পারে। হঠাৎ করে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়লে হাইপোথ্যালামিক অ্যামেনোরিয়া হতে পারে। ফলে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে পিরিয়ডে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রিয়জনের বিয়োগ, ব্রেকআপ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা অন্য কোনো বড় ধরণের মানসিক আঘাতের ফলে এই সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

 

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণ ও করণীয়

অনিয়মিত ঋতুস্রাব

নারী শরীরে অনিয়মিত ঋতুস্রাব একটি প্রচলিত সমস্যা। সাধারণত একজন নারীর জীবনে ঋতুচক্র শুরু হওয়ার পর থেকে ২১ দিন থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে যেটি হয় সেটি নিয়মিত ঋতুস্রাব। আর যদি ২১ দিনের আগে বা ৩৫ দিনের পরে হয় তবে সেটিকে অনিয়মিত ঋতুস্রাব বলে।

অনিয়মিত ঋতুস্রাব সাধারণত যৌবনের প্রারম্ভে এবং যৌবন শেষে হতে পারে। যৌবনের প্রারম্ভে সাধারণত ১২ থেকে ২০ বছর বয়সে কারো শরীরের ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন যদি অপরিপক্ব (প্রিমেচিউর) থাকে তবে অনিয়মিত ঋতুস্রাব হয়। আবার নারী শরীরে মেনোপজ শুরু হওয়ার আগে এ ধরনের সমস্যা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণ

শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের তারতম্যের কারণে এই সমস্যা হয়।
বিবাহিত নারীরা হঠাৎ জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ বন্ধ করে দিলে হতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপের ফলে হতে পারে।
শরীরের রক্ত কমে গেলে অর্থাৎ এনিমিয়া হলে অনিয়মিত মাসিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অনেকের ক্ষেত্রে ওজন বেড়ে গেলে এই সমস্যা হয়।
জরায়ুর বিভিন্ন জটিলতার কারণে হতে পারে।
সহবাসের সময় পুরুষের শরীর থেকে আসা অসুখের কারণে হতে পারে। যেমন : গনোরিয়া, সিফিলিস ইত্যাদি।
শরীরে টিউমার ও ক্যানসার ইত্যাদি অসুখে হতে পারে।
প্রি মেনোপজের সময় হয়ে থাকে।
যেসব নারী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান সেসব নারীর অনিয়মিত ঋতুস্রাব হতে পারে।
সমস্যা

প্রতিমাসে নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় না। এক মাসে রক্তপাত হলে হয়তো আরেক মাসে হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস পরপর হয়ে থাকে।
ঋতুস্রাব বেশি সময় ধরে হয়। কখনো অল্প রক্তপাত হয় আবার কখনোও বেশি হয়।
সন্তান ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়।
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হতে পারে।
এ ছাড়া মেজাজ খিটখিটে থাকা এবং অস্বস্তিবোধ তৈরি হয়।
চিকিৎসা

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত হরমোনাল থেরাপি দেওয়া হয়। কারো ক্ষেত্রে যদি বেশি ওজনের জন্য এই সমস্যা হয় তবে ডায়েট ও ব্যয়াম করতে বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে মেয়ের পাশাপাশি মাকেও পরামর্শ (কাউন্সিলিং) দেওয়া হয়। আর সন্তান ধারণক্ষম বয়সে সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে। বেশি রক্তপাত হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা উচিত।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন

যদি বছরে তিন বারের বেশি ঋতুস্রাব না হয়।
যদি ঋতুস্রাব ২১ দিনের আগে এবং ৩৫ দিনের পরে হয়।
ঋতুস্রাবের সময় বেশি রক্তপাত হলে।
সাত দিনের বেশি সময় ধরে ঋতুস্রাব হলে।
ঋতুস্রাবের সময় খুব ব্যথা হলে।
জীবনযাপনে পরিবর্তন

শরীরের ওজন সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
মানসিক চাপ মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।
পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে।
আয়রন জাতীয় খাবার খেতে হবে যাতে শরীরে পরিমিত পরিমাণে রক্ত থাকে।

ডা. সামছাদ জাহান শেলী : সহযোগী অধ্যাপক, বারডেম হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।